ইরাকে কুর্দীদের বিরুদ্ধে তুর্কী অভিযান
২০ অক্টোবর, ২০১১ ২:৩০ পূর্বাহ্ণবিবিসি
হাক্কারি প্রদেশে তুর্কী সেনাবাহিনীর টহল -

কুর্দী জঙ্গীদের চালানো একাধিক হামলায় তুরস্কের বেশ কিছু সৈন্য হতাহত হওয়ার পর তুরস্কের সেনারা উত্তর ইরাকের কুর্দী ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে। গত সাতাশ বছর ধরে সশস্ত্র কুর্দী গোষ্ঠী পিকেকে-র সাথে তুরস্ক রাষ্ট্রের সংঘর্ষ চলছে, কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তুরস্কের সেনাদের ওপর এটাই ছিল কুর্দীদের চালানো সবচেয়ে সাঙ্ঘাতিক হামলা।

তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ইরাক সীমান্তের কাছে যে হাক্কারি প্রদেশ আছে, সেখানেই এদিন ভোররাতের দিকে এই হামলা চালানো হয়।

ওই প্রদেশের স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, তুরস্কের বিভিন্ন সামরিক ইউনিটের ওপর কুর্দী জঙ্গীরা দুদুটো অতর্কিত আক্রমণ চালায়। তুরস্কের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, ওই হামলায় নিহত হন অন্তত ২৬জন সৈনিক, জখম হন আরও কমপক্ষে ১৮জন সেনা। এদিকে হাক্কারিতে ওই হামলা চালানোর কিছুক্ষণ পরেই দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যত্র কুর্দীরা আরও একটি বিধ্বংসী বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় – তাতেও অন্তত পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তা ও তিনজন বেসামরিক ব্যক্তি প্রাণ হারান।

তুরস্কের প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লা গুল কঠোর ভাষায় এই হামলার নিন্দা করে স্পষ্ট জানিয়ে দেন – তাঁর দেশ এর বিরাট বদলা নেবে। তিনি বলেন, ‘যারা মনে করছে এই সব হামলা চালিয়ে আমরা তুরস্ক রাষ্ট্রের ভিত নড়িয়ে দিতে পেরেছি – তাদেরকে জানিয়ে দিতে চাই আমরা এর ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ নেব।` তাঁর কথায়, ‘এই হামলাকারীরা খুব শিগগিরি টের পাবে তুরস্কের বিরুদ্ধে বন্দুক আর কামান দিয়ে হামলা চালিয়ে কোনও লাভ নেই – এই আক্রমণ করে তারা কিছুই পাবে না।`

গত প্রায় তিন মাস ধরেই তুরস্কের বিমানবাহিনীর বোমারু বিমান উত্তর ইরাকের ভেতর – যেখানে পিকেকে বা কুর্দীস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির মূল ঘাঁটিগুলো রয়েছে – সেখানে লাগাতার বোমাবর্ষণ করে চলেছে।

আসলে বেশ কয়েক মাস ধরেই দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বেড়ে চলেছে, কিন্তু এদিনের হামলায় একসঙ্গে অনেক সৈনিকের মৃত্যুর পর ক্ষিপ্ত তুরস্ক কুর্দী এলাকায় সর্বাত্মক অভিযান চালাতে এতটুকুও দেরি করেনি। এমন কী শুধু আকাশ থেকে বোমা ফেলাই নয়, কুর্দী জঙ্গীদের তাড়া করে তুরস্কের স্থল সেনারা ইরাকী ভূখন্ডের ভেতর ঢুকে পড়তে পুরোপুরি প্রস্তুত বলেও জানা গেছে।

প্রেসিডেন্ট আবদুল্লা গুলও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, পিকেকে-র জঙ্গীদের যারা মদত দিচ্ছে, তাদেরকেও এর পরিণাম ভোগ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘যারা এই জঙ্গীদের সহায়তা করছে বা মদত দিচ্ছে – এবং যারা তাদের এইভাবে যা খুশি করতে বা অবাধে চলাফেরা করতে দিচ্ছে তারা অবশ্যই এখন চরম শিক্ষা পাবে, তাদের কাজের ফল ভুগবে।`

প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘সারা বিশ্ব জেনে রাখুক, এই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তুরস্ক লড়াই চালাবে দৃঢ়সঙ্কল্প হয়ে এবং কঠোর প্রতিজ্ঞা নিয়ে। সন্ত্রাসবাদ দিয়ে কিছুতেই আমাদের ভয় দেখানো যাবে না এবং এর অবসান ঘটানোর জন্য যা-করা দরকার আমরা তার সব কিছু করতে প্রস্তুত।`

তুরস্কের জন্য জটিল সমস্যা

আসলে সম্প্রতি কুর্দীদের প্রতি তুরস্ক সরকারের নীতিতে প্রায় আমূল পরিবর্তন ঘটেছে বলা চলে। তুরস্কে ক্ষমতাসীন মধ্যপন্থী ইসলামী দল একেপি গোড়ার দিকে কুর্দীদের ব্যাপারে বেশ উদার মনোভাব দেখিয়েছিল – কুর্দী-অধ্যুষিত এলাকায় তারা অনেক লগ্নি করেছিল, আগের অনেক সরকারের তুলনায় কুর্দীদের অনেক বেশি সাংস্কৃতিক অধিকারের স্বীকৃতিও দিয়েছিল। কিন্তু এতে কুর্দীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা যেভাবে বেড়েছে আর কুর্দী বিদ্রোহীদের দিক থেকে সহিংসতার ঘটনা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে তুরস্ক সরকারকে এখন বাধ্য হয়েই অনেক কঠোর অবস্থান নিতে হয়েছে। এর সঙ্গে সামগ্রিকভাবে ওই অঞ্চলের ব্যাপকতর অস্থিতিশীলতার কারণেও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্যরা বিদায় নিতে চলেছে, সিরিয়ার অখন্ডতা টিঁকবে কি না প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তা নিয়েও। এই দুটো দেশেই তুরস্কের মতোই বিরাট সংখ্যক কুর্দী সংখ্যালঘুরা আছেন – এবং সব মিলিয়ে কুর্দী জাতিসত্ত্বার চেতনা নতুন করে উৎসাহ পাচ্ছে, যাতে তুরস্কের সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

পাঠকের মন্তব্য