৬ দশকের রাষ্ট্রনায়ক মুয়াম্মার গাদ্দাফি
২১ অক্টোবর, ২০১১ ৭:২২ অপরাহ্ণ
-

কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা রাষ্ট্রনায়ক। ৬ দশকের দীর্ঘ শাসনামলে দেশ-বিদেশে বীরের মর্যাদার সঙ্গে খলনায়কের কুখ্যাতি সবই অর্জন করেছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে রক্তপাতহীন এক সামরিক অভ্যুত্থানে লিবিয়ার তৎকালীন শাসক কিং ইদ্রিসকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন তরুণ গাদ্দাফি।

১৯৪২ সালে সির্তের এক বেদুইন পরিবারে গাদ্দাফির জন্ম। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বেদুইন সংস্কৃতি ধরে রেখেছেন তিনি। বেনগাজি ইউনিভার্সিটিতে ভূগোল বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও মাঝপথে তা বাদ দিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন যুবক গাদ্দাফি। ১৯৬৯ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে রক্তপাতহীন এক সামরিক অভ্যুত্থানে লিবিয়ার  ক্ষমতা দখলের পরে তিনি ইসলামঘেঁষা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ঐক্যবদ্ধ প্যান-আরব গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রেভ্যুলিউশনারি কমান্ড কাউন্সিল গঠন করে তার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং নিজেকে ইসলামিক সমাজতন্ত্রের প্রতিভূ হিসেবে দাঁড় করান।আরব জাতীয়তাবাদী মিসরীয় নেতা গামাল আবদেল নাসেরের একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন গাদ্দাফি। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল ইস্যুতে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেন। সামরিক বাহিনীতে থাকা অবস্থায় দেশের রাজতন্ত্র অবসানের পরিকল্পনা করেন এবং ব্রিটেনে সামরিক প্রশিক্ষণে তা আরও জোরদার হয়।

স্বাস্থ্যগত কারণে কিং ইদ্রিস বিদেশে অবস্থানের সুযোগে ১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাতে সামরিক আদেশ জারি করে সহজেই ক্ষমতায় আসেন গাদ্দাফি। লিবিয়াকে আরব প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। সে সময় বেশ কয়েকমাস বিদেশে ছিলেন ইদ্রিস। মাত্র ১০ দিন পরেই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রেভ্যুলিউশনারি কমান্ড কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

৭০-এর দশক এ সময় নিজের ক্ষমতা সুরক্ষিত করেন গাদ্দাফি। প্রতিষ্ঠা করেন নিজের রাজনৈতিক দর্শন যা পরে প্রচার পায় গ্রিন বুক নামে। লিবিয়ার তেল সম্পদের প্রতি বিদেশিদের আকৃষ্ট করেন। ১৯৭৩-৭৪ সালে মধ্যপ্রাচ্য তেল সংকটের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। এ সময় আফ্রিকা ও অন্যান্য আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন। শুরুর দিকে গাদ্দাফির এ ধরনের বিপ্লবী উদ্যোগ তাকে আরব বিশ্ব এবং অনান্য অঞ্চলের নায়কে পরিণত করে। এ সময়ে পশ্চিমের হুমকি-ধমকি থোড়াই পরোয়া করতেন তিনি। ১৯৭১ সালেই আরব সোস্যালিস্ট ইউনিয়ন (এএসইউ) গঠণের ঘোষণা দেন। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি গঠন হয় ১৯৭১ সালের ১১ জুন, প্রথম কংগ্রেস হয় ১৯৭২ সালের এপ্রিলে। শ্রেণী ও আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণের ঘোষণা দিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জনে সক্ষম হয় এএসইউ। ১৯৭৭ সালে দেশের নাম বদলে গ্রেট সোস্যালিস্ট পপুলার লিবিয়ান জামাহিরিয়াহ (জনতার রাষ্ট্র) রাখেন। এসময় দেশের সাধারণ মানুষদের পার্লামেন্টে তাদের মতামত জানানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। তবে তার বিরুদ্ধে স্বৈরশাসন টিকিয়ে রাখার জন্য হাজার হাজার মানুষকে অবৈধভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ও বন্দি করে রাখার অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

সমাজতান্ত্রিক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক দর্শন ও দিকনির্দেশনা নিয়ে গাদ্দাফি রচনা করেন বহুল আলোচিত 'গ্রিন বুক'। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে ৩ খ-ে এটি প্রকাশিত হয়। কিন্তু বাস্তবে গ্রিন বুকে লিপিবদ্ধ নীতি আদর্শের পথে হাঁটেনি লিবীয় রাষ্ট্রযন্ত্র। বরং ধীরে ধীরে দেশের ভেতরে ও বাইরে দুই ক্ষেত্রেই বিরোধ দমনে সশস্ত্র হয়ে ওঠেন গাদ্দাফি।১৯৭৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্প ডেভিডে আরব বিশ্বের তৎকালীন বিবদমান দুই প্রতিপক্ষ মিশর ও ইসরায়েলের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের জন্য তাদের মুখোমুখি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন গাদ্দাফি। তবে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সঙ্কট সমাধানে অত্যন্ত কঠোর দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আরব দেশ তার সমালোচনা করে। এসময় থেকে তার প্যান-আরব নীতি পরিবর্তিত হয়ে প্যান-আফ্রিকা পরিকল্পনায় রূপ নেয়। তার ঐক্যবদ্ধ আফ্রিকা গঠনের উদ্যোগই পরবর্তী সময়ে আফ্রিকান ইউনিয়নের জন্ম দেয়। তবে পশ্চিমা বিশ্বে সবসময়ই গাদ্দাফিকে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে দেখা হয়।

১৯৮০ সালে তার গঠিত বিপ্লবী কমিটি দেশের বাইরে অবস্থানরত গাদ্দাফিবিরোধীদের হত্যার জন্য বিশেষ স্কোয়াড পাঠায়। বিদ্রোহীদের দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের জন্য সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়। ১৯৮৪ সালে লন্ডনে লিবীয় দূতাবাসের বাইরে গাদ্দাফিবিরোধী এক বিক্ষোভের সময় দূতাবাসের এক বন্দুকধারীর গুলিতে ই ভোনে ফ্লেচার নামের এক তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হলে বিশ্বজুড়ে তা নিয়ে আলোচনার ঝড় ওঠে। ১৯৮৬ সালের ১৫ এপ্রিল সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি ও প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনকে সমর্থনের অভিযোগ তুলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান কর্নেল গাদ্দাফিকে 'পাগলা কুকুর' তকমা দেন। ১৯৮৬ সালে বার্লিনের ডিস্কোথেকে বোমা হামলা, ১৯৮৬ সালে প্যান আম ফ্লাইট ৭৩ হাইজ্যাক এবং ১৯৮৮ সালে প্যান আম ফ্লাইট ১০৩-এ বোমা হামলার (লকারবি হামলা) জন্য লিবিয়া তথা সরাসরি গাদ্দাফিকেই দায়ী করা হয়। বহুবছর ধরে অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন তিনি। এর ফলে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হয় লিবিয়াকে।

রাজনৈতিক কর্মকা-ের বাইরে বিশেষ ধরনের পোশাক আর অদ্ভুত সব কর্মকা- করেও খবরের শিরোনাম হয়েছেন তিনি। ২০০২ সালে লিবিয়ায় বিশ্বের প্রথম মিস নেট ওয়ার্ল্ড বিউটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তিনি। ইন্টারনেটভিত্তিক এ ধরনের প্রতিযোগিতা বিশ্বে এটাই প্রথম। একই বছরে ইতালীয় ফুটবল ক্লাব জুভেন্টাসের শেয়ার কেনেন তিনি। আমাজোনিয়ান গার্ড নামে তার বিশেষ রক্ষীবাহিনীর ৪০ সদস্যই ছিল নারী, যারা মার্শাল আর্ট থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক অস্ত্র চালনায় পারদর্শী ।

২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ লিবিয়ার উপর থেকে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। এর ফলে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে লিবিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হওয়ায় লিবিয়ার অর্থনীতি বেশ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ২০০৯ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে যান গাদ্দাফি। এ অধিবেশনে ১৫ মিনিটের বদলে দেড় ঘণ্টা ভাষণ দেন, জাতিসংঘের নীতিমালার অনুলিপি ছিঁড়ে ফেলেন এবং নিরাপত্তা পরিষদকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার সঙ্গে তুলনা করেন। একইসঙ্গে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোর জন্য ৭ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।

তবে ২০০৯ সালে অভিযুক্ত লিবীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরলে গাদ্দাফির পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হলে আবারো যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সমালোচনার মুখে পড়েন গাদ্দাফি।
২০১০ সালের শেষে তিউনিসিয়ায় ব্যাপক গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে তার রেশ লিবিয়ায়ও লাগে। আরব বিশ্বের অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা পশ্চিমা তোষণ নীতি অনুসরণ করলেও গাদ্দাফি সে পথে হাঁটেননি। তাই পশ্চিমা বিশ্ব মুখিয়েই ছিল। লিবিয়ায় একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের বিক্ষোভকে গণবিপ্লবে পরিণত করার ইন্ধন জোগায় পশ্চিমা জোট। তার পরের কাহিনী বেশ পরিষ্কার। গণআন্দোলনকে তেমন আমল না দিয়ে কঠোরহস্তে দমনের চেষ্টা চালান গাদ্দাফি। পরবর্তী সময়ে এই গণআন্দোলন গণবিদ্রোহে রূপ নেয় যা দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১৭ মার্চ গাদ্দাফির অনুগত নিরাপত্তা বাহিনীর হাত থেকে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষায় লিবিয়ায় উড্ডয়ন নিষিদ্ধ এলাকা প্রতিষ্ঠা এবং সেখানে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ১৯ মার্চ সেখানে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে পশ্চিমা যৌথবাহিনী। পরবর্তীতে ন্যাটোর নেতৃত্বে হামলা চলতে থাকে।

২০১১ মার্চ থেকে শুরু হয় গাদ্দাফি বাহিনীর বিরুদ্ধে পশ্চিমা যৌথ বাহিনীর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। আগস্টে রাজধানী ত্রিপোলির দখল হারিয়ে নিজ শহর সির্তে আত্মগোপন করেন গাদ্দাফি। একদিকে ন্যাটোর বিমান হামলা ও অন্যদিকে বিরোধী ন্যাশনাল ট্রাঞ্জিশনাল কাউন্সিলের যোদ্ধাদের হামলার মুখে গত ২২ অগাস্ট রাজধানী ত্রিপোলির দখল হারান গাদ্দাফি।

গত ২৩শে আগস্ট বিদ্রোহীরা তার বাব আল আজিজিয়া প্রাসাদ দখল করে নেয়। সেখান থেকে তার আগেই পালিয়ে যান মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও তার পরিবারের সদস্যরা। এর মধ্য দিয়েই মূলত গাদ্দাফির পতন ঘটে। তারপরও তার অনুগতরা লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে।২০ অক্টোবর জন্মশহর সিরতের নিহত হয়েছেন গাদ্দাফি।

 

সূত্র : ইন্টারনেট

পাঠকের মন্তব্য