পরীক্ষার মাধ্যমেই মেডিক্যালে ভর্তি!
৩১ আগস্ট, ২০১২ ২:৩৫ অপরাহ্ণ
-

সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল এবং ডেন্টাল কলেজে ভর্তির ব্যাপারে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই স্বাস্থ্যমন্ত্রী হঠাত্ করে ভর্তি পদ্ধতি বাতিল করায় বিপাকে পড়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং খোদ ভর্তি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য অধিদফতর। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের দুর্বার আন্দোলন ও সুশীল সমাজের তীব্র বিরোধিতার মুখে দ্বিধাবিভক্তি দেখা দিয়েছে সরকারের মধ্যেও। আদালতের রায় এ সঙ্কটকে আরও প্রলম্বিত করছে। তবে শেষ মুহূর্তে অন্তত এ বছরের জন্য হলেও পুরনো পদ্ধতিতেই ভর্তি পরীক্ষা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কয়েকটি সূত্র।


সূত্রগুলো বলছে, গত বছর ও চলতি বছর উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে সরকার এ বছরের জন্য পুরনো পদ্ধতিতেই (ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে) মেডিক্যালে ভর্তি নেওয়ার কথা ভাবছে। গত কয়েক দিনে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে স্বাস্থ্য অধিদফতর এমনই আভাস পেয়েছে বলে অধিদফতরের কয়েক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে মন্ত্রী জিপিএ’র ভিত্তিতে ভর্তির ব্যাপারেও প্রস্তুতি রাখতে বলেছেন বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক কর্মকর্তা।


ভর্তির নতুন সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কয়েক প্রতিনিধি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে গত কয়েক দিনে তাদের আলোচনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, মনে হচ্ছে সরকার এ বছর পুরনো পদ্ধতিতেই ভর্তি নেবে। তবে আমাদের দাবি অন্তত দু’বছর পুরনো পদ্ধতি চালু রাখতে হবে।


স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক বলেন, আমাদের দু’ধরনের প্রস্তুতিই রয়েছে। তবে কোনটি টিকবে, তা নির্ভর করছে আদালতের ওপর। অবশ্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. শিফায়েত উল্লাহ ‘ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তির সম্ভাবনাই বেশি’ বলে আভাস দিয়েছেন। তবে তিনি তা নিশ্চিত করেননি।


গত ১২ আগস্ট স্বাস্থ্য ও পরিবার-কল্যাণ মন্ত্রণালয় পরীক্ষা ছাড়াই ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্সে সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তির সিদ্ধান্ত নেয়।
সিদ্ধান্ত বাতিলে চাপ বাড়ছে : জিপিএ’র ভিত্তিতে ভর্তির ঘোষণার পরদিন থেকেই এই সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য চাপ বাড়ছে সরকারের ওপর। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন একদিকে তীব্র হচ্ছে, অন্যদিকে সে আন্দোলনে যোগ দিচ্ছে সুশীল সমাজও। সমাবেশ, গোলটেবিল বৈঠক ও সংহতি প্রকাশের মাধ্যমে রাজনীতিক, শিক্ষক ও চিকিত্সকসহ সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য সময় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।


সর্বশেষ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ পরীক্ষার মাধ্যমে মেডিক্যালে ভর্তির পক্ষে মত দিয়েছেন। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ছাত্রলীগের এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে ভর্তির স্বপ্ন নিয়ে আছে। আমি আশা করছি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টরা বাস্তবতা বিবেচনা করে ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করবেন।


ভর্তির নতুন সিদ্ধান্ত বাতিলে শনিবার সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিতে যাচ্ছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী প্রতিনিধি সকালের খবরকে বলেন, শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে নাগরিক সমাবেশ ডাকা হয়েছে। সমাবেশ থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবি মেনে নেওয়ার আল্টিমেটাম দেওয়া হবে। এর মধ্যে দাবি পূরণ না হলে বৃহত্ কর্মসূচি দেওয়া হবে।


উচ্চ আদালতও এ সঙ্কট নিরসনে মতৈক্যে পৌঁছতে পারেননি। পুরনো পদ্ধতিতে মেডিক্যালে ভর্তির নির্দেশনা চেয়ে ইউনুস আলী আকন্দ নামে এক আইনজীবীর দায়ের করা আবেদনে গত ২৭ আগস্ট দ্বিধাবিভক্ত আদেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। ফলে সমাধানে আবেদনটি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানোর কথা রয়েছে।


ক্ষোভ দুই মন্ত্রণালয়েও :  কোনো প্রকার পূর্ব আলোচনা ছাড়াই মেডিক্যালে ভর্তির নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার-এমন অভিযোগ করেছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, কখনই চিকিত্সা শিক্ষা পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংক্রান্ত কোনো তথ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয় না। এমনকি ভর্তি পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে কোনো পরামর্শ চাওয়া হয়নি। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (মেডিক্যাল শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. শাহ আবদুল লতিফ বলেন, জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের এক মাসের মধ্যে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে, সেটি আমার জানা ছিল না। ফলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হঠাত্ করেই নেওয়া নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সত্যিই দুরূহ।কারণ ফল প্রকাশের পর (প্রকাশ ১৮ জুলাই) ইতোমধ্যেই প্রায় দেড় মাস পার হতে চলেছে।


মেধার মানদণ্ডের কাজ চলছে : নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জিপিএ’র ভিত্তিতে ভর্তি করাতে মেধার মানদণ্ড তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. শিফায়েত উল্লাহ। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের মেধা তালিকা তৈরির জন্য ১২টি মানদণ্ড নির্ধারণ করা হচ্ছে। মানদণ্ড অনুযায়ী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় সমান জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে চতুর্থ বিষয় ছাড়া বেশি নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীরা মেধা তালিকায় এগিয়ে থাকবেন। এদের মধ্যে এগিয়ে থাকবেন চলতি বছর উত্তীর্ণ এইচএসসি শিক্ষার্থীরা। এরপর মেধা তালিকায় অগ্রাধিকার পাবেন এইচএসসিতে চতুর্থ বিষয়ের নম্বর ছাড়া জিপিএ-তে ভালো করা প্রার্থীরা।

এরপর থাকবেন এসএসসি ও এইচএসসিতে চতুর্থ বিষয়সহ এবং এইচএসসিতে চতুর্থ বিষয়সহ বেশি নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীরা। তিনি জানান, জিপিএ সমান হলে এইচএসসির পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের গ্রেড পয়েন্টের (জিপি) যোগফল আমলে নেওয়া হবে। সেক্ষেত্রেও যদি নম্বর সমান হয় তা হলে দেখা হবে এইচএসসিতে জীববিদ্যার জিপি, এরপর এইচএসসিতে ইংরেজির জিপি এবং তাতেও সমাধান না হলে এসএসসির পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও জীববিদ্যার জিপির যোগফল, এরপর এসএসসির জীববিদ্যা এবং তাতেও সমাধান না হলে এসএসসির ইংরেজির জিপি দেখা হবে। সর্বশেষ মেধার মানদণ্ড হিসেবে বয়সকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

পাঠকের মন্তব্য