দেশের চিংড়ি শিল্প হুমকীর মুখে
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২ ৪:০৬ অপরাহ্ণ

প্রতিবেশী দেশ ভারতের আগ্রাসী তৎপরতা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফালোভী মনোভাবে দেশের চিংড়ি শিল্প হুমকীর মুখে পড়েছে। প্রতি সপ্তাহে ভারত থেকে নিম্নমানের চিংড়ি বাংলাদেশে পুশইন করা হচ্ছে। রূপসা পাইকারি মৎস্য আড়তের কয়েকজন ব্যবসায়ী ভারতীয় এ চিংড়ির বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। ইতোমধ্যে কয়েকবার অপদ্রব্য পুশ করার অভিযোগে এসব ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হয়েছে। ভারত থেকে আসা এসব চিংড়ি অহরহ কোম্পানীতে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি দেশে উৎপাদন কম হওয়ায় কোম্পানীগুলো জেনেও না জানার ভান করে বিদেশী বাজার ঠিক রাখতে এসব চিংড়ি নিতে কার্পণ্য করছে না।

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তার দেয়া তথ্য মতে, গত বছর  দেশে চিংড়ির উৎপাদন ভালো ছিল। কিন্তু চলতি বছরে চিংড়ির উৎপাদন ভাল না। গত বছর এ জেলায় চিংড়ির উৎপাদন ছিল ১১ হাজার ৪৫৬ মেট্রিক টন। সেই তুলনায় এবার উৎপাদন কম হওয়ায় চাহিদা বেশী। যে কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে চিংড়ি আমদানি করছে। এ চিংড়ি বাজারে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাজার মার খাওয়ার আশংকা রয়েছে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর দেয়া তথ্য মতে, চলতি বছরের গত ৬ মাসে খুলনাঞ্চল থেকে রফতানি হয়েছে ১ কোটি ৭৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫২৬ কেজি চিংড়ি। ২০১১ সালে এর পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৪৭ লাখ ৬২ হাজার ৭৫৮ কেজি। ফলে চলতি বছরে এ সময়ে ২৪ লাখ ৪১ হাজার ৭৬৮ কেজি কম রফতানি হয়েছে । ফলে দেশে এ মওসূমে চিংড়ি উৎপাদন কম হওয়ায় মাছ কোম্পানীগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা মেটাতে পারছে না। অনেকটা না জানার ভান করে বিদেশে চিংড়ির চাহিদা মেটাতে বিকল্প পন্থা অবলম্বন করছে। কয়েক মাস ধরে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী যশোরের বেনাপোল ও সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর থেকে ভারতীয় হিমায়িত গলদা ও বাগদা চিংড়ি বাংলাদেশে আমদানি করছে। তবে বৈধ পথ ছাড়াও  চোরাই পথে এর কয়েকগুণ বেশি। পরে এগুলো স্থানীয় ডিপোতে রেখে দেশীয় উৎপাদিত চিংড়ি হিসেবে বিভিন্ন মাছ কোম্পানিতে বিক্রি করা হচ্ছে।

চিংড়ি চাষ ও রফতানি বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, সাতক্ষীরার বিপরীতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাগদা চিংড়ির বাজারে ধস নেমেছে। সেখানকার বাজারে এই চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০০ টাকা। অপরদিকে বাংলাদেশের রফতানিযোগ্য বাগদা চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। দুই প্রতিবেশী দেশে চিংড়ির মূল্যের এই তারতম্যের বিরূপ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। তারা বলেন, সাম্প্রতিককালে ভারত থেকে জাপানে রফতানিকৃত বিপুল পরিমাণ চিংড়ি ফেরত দিয়েছে আমদানিকারকরা। ভারতীয় চিংড়িতে ক্ষতিকর পদার্থ নাইট্রোফুরান ও ক্লোরামফটইকল জাতীয় পদার্থ পাওয়া গেছে, এই কারণ দেখিয়ে জাপানিরা তা ফেরত পাঠায়। ফলে পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এই চিংড়ি। তবে ভারত সরকার তা ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দেয় ।

সাতক্ষীরার ব্যবসায়ীরা জানান, ব্যবহার অযোগ্য ভারতীয় এই চিংড়ি বাংলাদেশে ঢুকতে শুরু করেছে। কখনও চোরাপথে আবার কখনও বাংলাদেশে স্বাদু পানির ভারতীয় সাদা জাতের মাছ রফতানির আড়ালে। সাতক্ষীরায় এরই মধ্যে অন্তত দুই দফায় এমন দুটি ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান । চোরাপথে আসা ভারতীয় নিম্নমানের ভাইরাসযুক্ত বাগদা চিংড়িতে সয়লাব হয়ে গেছে সাতক্ষীরা। জেলার হাটবাজারে এসব চিংড়ি বেচাকেনা চলছে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে রফতানিযোগ্য মানউন্নত চিংড়ির সঙ্গে ভারতীয় এই চিংড়ি যুক্ত হয়ে বিদেশে বাংলাদেশের বাজারের সুনাম নষ্ট হওয়ার আশংকা করছে মৎস্য বিভাগ। গত ৮ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার দেবহাটার ধোপাডাঙা সীমান্তে প্রায় এক টন ওজনের ভারতীয় বাগদা চিংড়ি আটক করেন বিজিবি সদস্যরা। ভারত থেকে এই চিংড়ি বাংলাদেশের বাজারে পাচার করা হয়। বিজিবি জানায়, সীমান্তে ভারতীয় চিংড়ি আটকের ঘটনা এটাই প্রথম।

গত ১২ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা বিজিবি ভারত থেকে ভুয়া এলসির মাধ্যমে আমদানি করা প্রায় ১৫ টন ভারতীয় বাগদা চিংড়ি আটক করে। বাংলাদেশে চিংড়ি আমদানিযোগ্য না তা নিষিদ্ধ, তার নিত্তি না করেই জেলা চোরাচালানবিরোধী টাস্কফোর্স প্রধান জেলা প্রশাসকের লিখিত নির্দেশে সব চিংড়ি মাটিচাপা দেয়া হয়। চাষীরা বলেন, ভারতীয় নিষিদ্ধ চিংড়ি বাংলাদেশের বাজারে রফতানি চালানের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়ার চেষ্টা চলছে। তারা তাদের ফেরত আসা চিংড়ি কৌশলে বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের মাধ্যমে চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের সাদা স্বর্ণ হিসেবে পরিচিত রফতানিযোগ্য চিংড়ি সম্পদের ওপর। তারা আরও জানান, বর্তমান সময়ে ভারতীয় চিংড়ি ভাইরাসযুক্ত।

মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ থেকে বিদেশের রফতানি বাজারে চিংড়ির ব্যাপক সুনাম ও কদর রয়েছে। ভারতীয় নিষিদ্ধ চিংড়ি বাংলাদেশের চিংড়ির সঙ্গে মিশ্রণ ঘটিয়ে তা অসাধু ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে রফতানি চালানে যুক্ত করা হতে পারে। কর্মকর্তারা বলেন, এতে অচিরেই বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির সুনাম ক্ষুণ্ণ হতে পারে। সাতক্ষীরা চিংড়িচাষী সমিতির সভাপতি সাবেক মন্ত্রী ডা. আফতাবউজ্জামান, বণিক সমিতির সভাপতি মোঃ আবদুল মান্নান, চিংড়ি পোনা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা, বরফ কল মালিক সমিতির সভাপতি আবু নাসের মোঃ আবু সাঈদ, কামরুল হক চঞ্চল, জামিল হায়দার টুটুল, বাদল দাস, বিশ্বনাথ ঘোষ জানান, ভারতীয় চিংড়ি বাংলাদেশে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা জরুরী ।

এদিকে ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন সূত্র জানায়, খুলনায় অবৈধভাবে চিংড়ি আমদানির সাথে রূপসা পাইকারি মৎস্য আড়তের ৬/৭ জন পাইকারী মাছ ব্যবসায়ী সরাসরি জড়িত। অনেকে তাদের নাম জানালে অর্থ প্রতিপত্তির কারণে কেউ তাদের নাম বলতে চান না।  সূত্রমতে, অভিযুক্ত ব্যবসায়ীরা গভীর রাতে ট্রাকে করে এসব চিংড়ি অন্যান্য মাছের সাথে খুলনা মহানগরীতে নিয়ে আসেন। তবে নগরীর প্রবেশদ্বারে পৌঁছালে সেখানে পুলিশ বা আইন-শৃক্মখলা বাহিনীর বাধা পেলে সেলামীর মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিরা তাদের ম্যানেজ করেন। নাম প্রকাশ না করে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, চোরাই পথে মাছ শহরে প্রবেশ করছে খবর নিশ্চিত না হয়ে মাছের কার্টুন খোলা যায় না। এতে মাছ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে। যে কারণে অনেকটা সহজেই চোরাচালানীর মাছ শহরে ঢুকে পড়ছে।

অপরদিকে এসব চিংড়ি রফতানির আগে মৎস্য মান নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর থেকে ছাড়পত্র নেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ পর্যন্ত যেসব চালান পাঠানো হয়েছে অজ্ঞাত কারণেই তাদের রিপোর্টে ‘চিংড়ি রফতানিযোগ্য নয়' এমন অভিযোগ দেয়া হয়নি। তবে বিভিন্ন সময় র‌্যাব অভিযান চালিয়ে স্থানীয় ডিপোগুলো থেকে অপদ্রব্য ও নিম্নমানের চিংড়ি জব্দ করেছে। যার অধিকাংশই আনা হয় ভারত থেকে।

মৎস্য অধিদফতরের পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ খুলনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আব্দুর রাশেদ বলেন, চলতি বছরের গত ৮ মাসেও কোন মাছ কোম্পানীর বিরুদ্ধে অপদ্রব্য মিশানো মাছ রাখার অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)'র পরিচালক মনোরঞ্জন বিশ্বাস বলেন, ইউরোপ আমেরিকায় অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব পড়েছে আমাদের দেশে চিংড়ি শিল্পে। যে কারণে চিংড়ির চাহিদা কম। ফলে কিছুটা প্রভাব রফতানি খাতের ওপর পড়েছে। এছাড়াও উৎপাদনগত কিছুটা প্রভাব পড়েছে।

ভারত থেকে চিংড়ি আমদানি বা চোরাই পথে আসা চিংড়ি গ্রহণ করার ব্যাপারে স্থানীয় কোন কোম্পানীর সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্ট এসাসিয়েশনের সহ-সভাপতি শেখ আব্দুল বাকি। তিনি বলেন, ভারত থেকে চোরাই পথে আসা ও আমদানি করা মাছ শহরে স্থানীয় ডিপোগুলোতে আসতে পারে। তবে কোন মাছ কোম্পানীর সাথে এর সংশ্লিষ্টতা নেই।  যদি থেকেও থাকে তবে সমিতির পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পাঠকের মন্তব্য