অলি আহাদের লড়াকু জীবন (১৯২৮-২০১২)
২০ অক্টোবর, ২০১২ ৪:০৮ অপরাহ্ণ
-

বায়ান্নর ভাষা সংগ্রামে জীবনবাজি রেখে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন, ভাষা সৈনিক অলি আহাদ ছিলেন তাদের অন্যতম। রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার মাধ্যমে তিনি থেমে ছিলেন না, পরবর্তী স্বাধীকার আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে তাকেই প্রথম কারাগারে যেতে হয়। সক্রিয় এই রাজনীতিবিদ জীবনের শেষ সময়ে পযন্ত ডেমোক্র্যাটিক লীগের চেয়ারম্যান ছিলেন। একই সঙ্গে আশির দশকের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘ইত্তেহাদ’-এর সম্পাদক ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে ২৯ মার্চ, ১৯৪৮ তৎকালীন সরকার তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার বছরের জন্য বহিষ্কার করে। তিনি বি.কম সম্পন্ন করলেও তৎকালীন সরকার তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.কম করতে দেয়নি। দীর্ঘ ৫৮ বছর পর ২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই আদেশ প্রত্যাহার করে নেয়। এছাড়া ১৯৪৭-১৯৭৫ সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনের শেষ ভাগে তিনি ডেমোক্র্যাটিক লীগ নামক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এছাড়া জাতীয় রাজনীতিতে তার অভিজ্ঞতা সংবলিত গ্রন্থ “জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-১৯৭৫” এর প্রণেতা তিনি। ভাষা সৈনিক অলি আহাদের জন্ম ১৯২৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইসলামপুরে। তাঁর পিতা আবদুল ওহাব ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার। পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে। প্রাথমিক পড়াশুনা শেষে ১৯৪৪ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে গণভোটে তিনি ত্রিপুরা জেলার চার সদস্য বিশিষ্ট ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনের কারণে ১৯৪৬ সালে আইএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হয়েছে। ১৯৪৭ সালে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি.কমে ভর্তি হন। কলেজ জীবনেই তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মী হিসাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। সেখান থেকেই তার রাজনীতি শুরু। ১৯৪৮ সালে ৪ জানুয়ারি গঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। ১৯৫২-এর রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনে অন্যতম নেতৃত্ব দানকারী সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদকও তিনি। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের জন্য তাকে প্রথম কারাগারে নিক্ষিপ্ত করে পাকিস্তানি পুলিশ। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.কম পরীক্ষায় প্রথম হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তত্কালীন কর্তৃপক্ষ তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.কম পড়ার সুযোগ না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে। ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা ১৯৫২ সাল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকাসহ সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অফিস আদালতে এবং রাজপথ ছিল উত্তাল। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিমনেসিয়াম মাঠের পাশে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত) গেটের পাশে ছাত্র-ছাত্রীদের জমায়েত শুরু হতে থাকে। সকাল ১১টায় কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, আব্দুল মতিন, গাজীউল হক, শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্ব দিতে থাকেন এই সমাবেশের। এর আগে ২০ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার ভাষা আন্দোলনের প্রস্তুতিকে তছনছ করে দেওয়ার জন্য ঢাকাতে সমাবেশ, মিছিল-মিটিংয়ের ওপর ১৪৪ ধারা জারি করে। সকালের দিকে ১৪৪ ধারা ভাঙার ব্যাপারে ছাত্র-রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. এস এম হোসেইনের নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষকরা ১৪৪ ধারা না ভাঙার জন্য ছাত্রদের অনুরোধ করেন। বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সময় ধরে উপস্থিত ছাত্রনেতাদের মধ্যে আব্দুল মতিন এবং গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে মত দিলেও সমাবেশ থেকে অন্য নেতাদের এ ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হন। এ অবস্থায় বাংলার দামাল ছেলেরা দমনমূলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ ১১৪ ধারা ভঙ্গ করতে বদ্ধপরিকর ছিল। সংগ্রাম পরিষদের সভায় আবদুল মতিন, অলি আহাদ ও গোলাম মওলা ১১৪ ধারা ভাঙার পক্ষে ভোট দেন। সেখানে অলি আহাদ ছিলেন প্রথম ১৪৪ ধারা ভাঙার অগ্রবর্তী সৈনিক। ১৪৪ ধারা ভাঙার জন্য ছাত্ররা মিছিল বের করলে পুলিশের সঙ্গে ছাত্র জনতার সংঘর্ষ হয়। স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে উঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বুলেট আর লড়াই শুরু হয়। পুলিশ লাঠিচার্জ এবং গুলি বর্ষণ শুরু করে। গুলিতে ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত (ঢাবি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মাস্টার্সের ছাত্র), রফিক উদ্দিন ও আব্দুল জব্বার নামের তিন তরুণ মারা যায়। এছাড়া নাম না জানা আরো অনেকের সঙ্গে সালামও সেদিন গুলিবিদ্ধ হন। ২৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশ নিরাপত্তা আইনে রাজনীতিবিদ আবুল হাশিম, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক অজিতকুমার গুহ, পুলিন দে, অধ্যাপক পৃথ্বিশ চক্রবর্তী, অলি আহাদ প্রমুখকে গ্রেফতার করে তৎকালীন সরকার। রাজনৈতিক জীবন তার রাজনীতির শুরুটা ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে। তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনের মধ্য তিনি মওলানা ভাসানীর সঙ্গে প্রগতিশীলদের পক্ষে যোগ দেন। সাপ্তাহিক ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী জনমত গঠন করেন। ইত্তেহাদে বতর্মান সময়ের অনেক সম্পাদক লেখালেখি করতেন। তাঁর রচিত “জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫” নামক গ্রন্হটি এ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল। স্বাধীনতা যুদ্ধেও এই ভাষা সৈনিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে তিনি আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনা বাস্তবায়নের জন্য শাসকদের ওপর তিনি চাপ সৃষ্টি করেন। তত্কালীন সরকারের অত্যাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে দুঃশাসন বিরোধী তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। বিশেষ ক্ষমতা আইনে সরকার তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়৷ তিনি ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সৃষ্ট একদলীয় স্বৈরশাসন তথা বাকশালের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হন। বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে পরিচালিত সকল সংগ্রামে অকুতোভয় এই লড়াকু জননায়ক আজীবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আশির দশকে সামরিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আপোসহীন ভূমিকার কারণেও তাঁকে একাধিকবার গ্রেফতার করে কারাগারে আটকে রাখা হয়। এরশাদ সরকার সামরিক ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিচার করে। ওই সময় তার হাতেগড়া জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ইত্তেহাদকে নিষিদ্ধ করা হয়। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তাকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়।

পাঠকের মন্তব্য