ভারতীয় ছিটের বাংলাদেশজীবন
২০ অক্টোবর, ২০১২ ৪:২৫ অপরাহ্ণ
-

প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত হলেও বাংলাদেশেরই নাগরিক সুবিধা ভোগ করছে বাংলাদেশি ভূখণ্ডে থাকা ভারতীয় ছিটমহলের বাসিন্দারা। বাংলাদেশেরই টাকায় হচ্ছে ছিটমহলের রাস্তা-ঘাট ও স্কুল-কলেজসহ আর সব প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এ সব খণ্ড খণ্ড ভারতীয় ভূখণ্ডের বাসিন্দারা পাচ্ছেন বয়স্ক ভাতা। চিকিৎসাও চলছে বাংলাদেশি হাসপাতালে। বিদেশি ছিটমহলের জমিতে উৎপাদিত ফসলও বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশে। এমনকি বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে পুলিশ, বিজিবিসহ স্পর্শকাতার অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিও করছেন ভারতীয় ছিটমহলের অনেক বাসিন্দা।

যদিও এসবে সন্ত্রষ্ট নয় ভারতীয় ছিটমহলের নাগরিকরা। ভারতের নাগরিক সুবিধা পেতে উন্মুখ হয়ে আছে তারা। এজন্য তাদের নানামুখী সীমাদ্ধতার অভিযোগ যেমন আছে, তেমনি আছে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত হওয়ার আক্ষেপও।

আবার দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশের আলো-হাওয়া ও সুযোগ সুবিধা নিয়ে বেড়ে ওঠা এসব ছিটমহলের বাসিন্দাদের অনেকেই আর ভারতের নাগরিক হয়ে থাকতে চাইছেন না। বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে মূলস্রোতে মিশতে চাইছেন তারা।

সম্প্রতি সরেজমিনে লতামারি, বাকডোবরা, কালিবাড়ি ও ছিটের বাড়িসহ কয়েকটি ছিটমহল ঘুরে দেখা যায়, এসব ছিটমহলের রাস্তা-ঘাট বেশ উন্নত, যা বাংলাদেশ সরকারেরই তৈরি। সম্ভ্রান্তদের বাড়ি-ঘর পাকা। এমনকি ছিটমহলবাসীর চিকিৎসাও চলছে বাংলাদেশি হাসপাতালে।

এসব ছিটমহলের ছেলেমেয়েরা ভর্তি হচ্ছে বাংলাদেশেরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। পরিচয় গোপন করে তৈরি করছে জাতীয় পরিচয়পত্র। শুধু তাই নয়, পুলিশ, বিজিবিসহ বাংলাদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও চাকরিও করছেন ভারতীয় ছিটমহলের অনেক বাসিন্দা। বয়স্ক ভাতাসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলতঃ স্থানীয় বাংলাদেশি জনপ্রতিনিধিদের মদতেই ভারতীয় ছিটমহলবাসী বাংলাদেশে আইডিকার্ড করে ভোট পর্যন্ত দিতে পারছে। এমনকি স্থানীয় প্রসাশনের চোখ এড়িয়ে পরিচয় গোপন করে সরকারি চাকরিও চালিয়ে যাচ্ছেন অনেক ভারতীয় ছিটমহলবাসী।

এমনই একজন বাঁশকাটা ছিটমহলের গৌরাঙ্গ মোহন রায়। তিনি বর্তমানে পাবনার সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজে গণিত বিভাগের শিক্ষক পদে কর্মরত।

এছাড়া ট্রাফিক সার্জেন্ট হিসেবে বাংলাদেশে চাকরি করছেন কালিবাড়ি ছিটমহলের বাসিন্দা মোমিন হোসেন।

রতনপুর ছিটমহলের আলিমুন্নেসার ভোটার আইডি কার্ড অনুযায়ী, তিনি রহমানপুর গ্রামের বাসিন্দা। গত পাঁচ বছর আগে থেকে তিনি বয়স্ক ভাতাও পাচ্ছেন। এইকভাবে এ ছিটমহলের বাসিন্দা মফিজুল হক, তার স্ত্রী রাশিদা বেগমসহ প্রায় অধিকাংশ মানুষই পরিচয় গোপন করে ভোটার আইডি কার্ড সংগ্রহ করেছেন।

বাকডোবরা ছিটমহলের বাসিন্দা সলেমান আলী বলেন, “সত্য কথা বলতে এখন আমাদের সবারই বাংলাদেশি ভোটারআইডি কার্ড আছে। সন্তানদের পড়ালেখা চাকরি-বাকরির জন্যই এগুলো দরকার হয়।”

পাটগ্রাম থানাধীন ভারতের ১৬ নম্বর ভোটবাড়ি ছিটমহলের বাসিন্দা ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ মো. আজহারউদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, “আমরা বাংলাদেশি হতে চাই। এখানকার সব মানুষই তাই চায়। আমরা নামেই শুধু ভারতের ছিটে বাস করি। যে দেশ থেকে কোন সুযোগ সুবিধা পাই না, নামে সে দেশের নাগরিক হয়ে লাভ কি!’ বেশ আক্ষেপের সঙ্গেই কথাগুলো বলছিলেন

১৭ নম্বর ভোটবাড়ি ছিটমহলের বাসিন্দা মাজেদা বেগম বলেন, “আমরা ভারতে যেতে পারি না, কেনা কাটা করতে পারি না। সবই করি এদেশে। তাহলে ভারতের নাগরিক হয়ে লাভটা কি?”

তিনি জানান, তার ছেলে মেয়েরা সবাই এখানকার স্কুল, কলেজেই পড়ে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের বিয়েও হয়েছে এদেশেই।

আজহারউদ্দিন বলেন, “আমার পৈত্রিক বাড়ি ভারতের কুচবিহারের মেখলিগঞ্জে। শেষবার কবে গিয়েছি মনে নেই। তবে সেখানে গিয়েও লাভ নেই। খাদ্যসহ কিছুই সেখান থেকে আনতে পারিনে। ছিটমহলের জমি-জমা বিক্রি করতে পারিনে। আমাদের খাবার-দাবার, বাজার-ঘাট, ব্যবসা-বাণিজ্য সবই করতি হয় বাংলাদেশে।”

রতনপুর ছিটমহলের শহীদুল ইসলাম বলেন, “আগে ভারত থেকে চিনিসহ বিভিন্ন ধরনের মালামাল এনে বাংলাদেশে বিক্রি করতাম। এখন সে রাস্তাও বন্ধ। আমরা ভারতে উঠতে পারিনে। অথচ খাতা-কলমে নাকি আমরা সেদেশের বাসিন্দা।”

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কুচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ জেলার বিচ্ছিন্ন লোকালয়ে বাংলাদেশের রহমতপুর মৌজার অভ্যন্তরে ভারতের এই রতনপুর ছিটমহল। ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত নো ম্যানস ল্যান্ড থেকে মাত্র এক কিলোমিটার অভ্যন্তরে এর অবস্থান। এখানকার প্রায় ২৫০টি পরিবার নিজ ভূমে পরবাসী।

তারা জানায়, ভারতের বাসিন্দা নামে পরিচিত হলেও তাদেরর সহজে ভারতে যাওয়া-আসার সুযোগ আশি দশক পর্যন্ত ছিলো। এখন তারা সবকিছুই করেন বাংলাদেশে। কেনাকাটা থেকে শুরু করে তাদের উৎপাদিত পণ্যও বিক্রি করতে হয় বাংলাদেশের হাটবাজারে।

ভোটবাড়ি ছিটমহলের গরু ব্যবসায়ী গোলাপ হোসেন বলেন, “ভারতের বাসিন্দা বলে বাংলাদেশ সাহায্য করে না। আর বাংলাদেশের ভেতরে থাকি বলে ভারত সাহায্য দেয় না। আমরা কারো কাছ থেকে সাহায্য পাইনে। এই গরীবগুলোরে কেউ একটু লবণ দিয়েও সাহায্য করে না। গায়ে গতরে খেটে খাই বলেই এখনো বেঁচে আছি।”

বাংলাদেশ থেকে সুযোগ সুবিধা পেলেও এরকম অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে থাকতে চান না বলে জানান অধিকাংশ ছিটমহলবাসী।

বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির লালমনিরহাট শাখার সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আছি। আমরা আমাদের বাপ-দাদার ভিটামাটি ছেড়ে, এখানকার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে যেতে চাই না। শুধু চাই ,বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ছিটমহল বিনিময়ের বিষয়ে প্রটোকল চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন হোক।”

ছিটমহলের জন্মকথা
বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে গত কয়েক দশক ধরেই অন্যতম আলোচনা ও বিরোধের বিষয় হয়ে আছে রাষ্ট্রীয় ভৌগলিক সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু ভূখণ্ড। উভয় দেশেরই মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এসব জনপদের পরিচিতি ছিটমহল নামে।

আর এই ছিটমহল মানে ভারতের ভেতরে বাংলাদেশের আর বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের ভূখণ্ড। তবে বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ভারতীয় ছিটমহলের মধ্যেও আবার বাংলাদেশের ভূখণ্ড থাকারও নজির রয়েছে।

কুড়িগ্রামে ভারতের ছিটমহল দাশিয়ারছড়ার ভেতরেই রয়েছে চন্দ্রখানা নামে বাংলাদেশের এক ছিটমহল।

বস্তুত ভারত ভাগের প্রাক্কালে ১৯৪৭ সালে প্রণিত এক ব্রিটিশ আইন এসব ছিটমহল জন্মের সুযোগ তৈরি করে দেয়।

ওই আইনে বলা হয়, উপমহাদেশের স্বাধীন অঞ্চলগুলো তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবে অথবা চাইলে স্বাধীন সত্ত্বা নিয়েও থাকতে পারবে তারা।

এ আইনের সুযোগ নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে যোগ দেয় রাঙামাটির রামগড় ও পূর্ব বান্দরবান। আর পূর্ব সীমান্তের পার্বত্য ত্রিপুরা ও উত্তরের কুচবিহার যোগ দেয় ভারতে।

কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় কুচবিহার নিয়ে।

জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ তখন কুচবিচারের রাজা। তার জামিদারি বিস্তৃত ছিলো বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার কিছু অংশে।

অপরদিকে রংপুর ও দিনাজপুরের জমিদারের কিছু তালুক ছিল কুচবিহারের সীমানায়। ভারত ভাগের সময় এসব জমি নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে ব্যর্থ হন তারা।

এ পরিস্থিতিতে ১৯৪৭ সালে বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমারেখা টানার পরিকল্পনা করেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। স্বদেশি আইনজীবী সিরিল র‌্যাডক্লিফের নেতৃত্বে সীমানা নির্ধারণের কমিশন গঠন করে দেন তিনি।

দায়িত্ব নিয়ে ১৯৪৭ সালের ৮ জুলাই লন্ডন থেকে ভারত আসেন র‌্যাডক্লিফ। মাত্র ছয় সপ্তাহের মাথায় ১৩ আগস্ট সীমানা নির্ধারণের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

এর তিন দিন পর ১৬ আগস্ট সীমানার মানচিত্র প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু তাড়াহুড়োর কাজে স্বভাবতই অনেক ভুল-ভ্রান্তি-অপূর্ণতা রয়ে যায়। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হয়নি। যথার্থ হয়নি র‌্যাডক্লিফ কমিশনের সীমানা নির্ধারণ। উপরন্তু কমিশন সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তা আর জমিদার, নবাব, স্থানীয় রাজনীতিবিদরা নিজেদের স্বার্থে দেশভাগের সীমারেখা নির্ধারণে প্রভাব ফেলে বলেও অভিযোগ ওঠে।

এসবের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে ভারতের ভেতরে পূর্ব পাকিস্তানের কিছু ভূখণ্ড ও পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরে ভারতের কিছু ভূখণ্ড রয়ে যায়। মূল রাষ্ট্রীয় সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন এসব ভূখণ্ডই পরবর্তীতে ছিটমহল নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ঝুলতে থাকা ছিটমহল সমস্যা বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সমস্যায় পরিণত হয়।

বাংলাদেশ ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের হিসাবে, উত্তরবঙ্গের লালমনিরহাটের পাটগ্রাম আর কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারী থানার কিছু জমি ভারতের সীমান্ত জেলা কুচবিহারের অধীনে রয়েছে।

অপরদিকে কুচবিহারের কিছু জমি বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার বোদা ও দেবীগঞ্জ, নীলফামারীর ডিমলা, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম এবং কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় রয়েছে।

এসব নিয়ে ১৯৯৬ সালের ১ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশের তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআর ও ভারতের বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক হয় কলকাতায়। ওই বৈঠকের সিন্ধান্ত অনুযায়ী ওই বছরই মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন করে তৈরি করা হয় ছিটমহলের তালিকা।

ওই তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভারতের মোট ১৬২ ছিটমহলের আয়তন দাঁড়ায় ২৪ হাজার ২৬৮ দশমিক ০৭ একর।

ওই তালিকা থেকে আরো জানা যায়, ভারতের ভেতরে বাংলাদেশের ছিটমহল রয়েছে ৫১টি। এগুলোর আয়তন ৭ হাজার ১১০ দশমিক ০২ একর। অপরদিকে বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহলের আয়তন ১৭ হাজার ১৫৮ দশমিক ০২ একর।

সাম্প্রতিক জনগণনা অনুযায়ী, ভারতী ছিটমহলের লোকসংখ্যা ৩৭ হাজার। আর বাংলাদেশের ছিটমহলে বাস করে ১৪ হাজার মানুষ।

ভারতীয় ছিটমহলগুলোর অধিকাংশই রয়েছে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে। এ সবের মধ্যে লালমনিরহাটে ৫৯, পঞ্চগড়ে ৩৬, কুড়িগ্রামে ১২ ও নীলফামারিতে চারটি ভারতীয় ছিটমহল রয়েছে।

অপরদিকে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের অবস্থান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে। এর মধ্যে ৪৭টি কুচবিহার ও চারটি জলপাইগুড়ি জেলায় অবস্থিত।

ছিটমহলবাসীকে মুক্তি দিতে ছিটমহল সমস্যা সমাধানের উদ্যোগও নেওয়া হয় বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু ভেস্তে যায় সব ক’টিই।

ছিটমহল সমস্যা সমাধানের সর্বপ্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৪৭ সালে। কিন্তু পাক-ভারত বৈরিতায় ভেস্তে যায় সেটা।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নূন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ১৯৫৮ সালে চুক্তির মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। বেরুবাড়ী ছিটমহল হস্তান্তরের একটি যৌথ ঘোষণায়ও সই করেন তারা।

ওই চুক্তি অনুযায়ী, বেরুবাড়ীর উত্তর দিকের অর্ধেক অংশ ভারত এবং দক্ষিণ দিকের অর্ধেক অংশ ও এর সংলগ্ন এলাকা বাংলাদেশের পাওয়া কথা ছিলো।

পরবর্তীতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এক আদেশে এ সম্ভাবনা আটকা পড়ে।

১৯৫৮ সালের চুক্তিতে ছিটমহল বিনিময়ের কথা উল্লেখ থাকলেও এ ব্যাপারে ভারতের সংবিধানের ১৪৩ ধারা সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের মতামত চান দেশটির তৎকালীন রাষ্ট্রপতি।

তখন আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংবিধানে সংশোধনীর মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে হবে।

পরে ভারতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধনী আর জনগণনার অজুহাতে ছিটমহল বিনিময় দফায় দফায় বিলম্বিত হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালের ১৬ মে উভয় দেশের স্থল সীমানা চিহ্নিতকরণ বিষয়ক এক চুক্তিতে সই করেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।

ওই চুক্তিতে উভয় দেশের মধ্যে দ্রুত ছিটমহল বিনিময়ের তাগিদ দেওয়া হয়।

মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির নামে ওই চুক্তিতে আরো বলা হয়, দক্ষিণ বেরুবাড়ী ইউনিয়নের দক্ষিণ দিকের অর্ধাংশ ও পার্শ্ববর্তী ছিটমহলগুলো পাবে ভারত। বিনিময়ে দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা ছিটমলের অধিকারী হবে বাংলাদেশ। এছাড়া বাংলাদেশের পানবাড়ী মৌজার সঙ্গে দহগ্রামকে সংযুক্ত করতে বাংলাদেশকে ‘তিন বিঘা’ নামে ১৭৮ দশমিক ৮৫ মিটার এলাকা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেবে ভারত।

এ চুক্তি অনুযায়ী ভারতকে বেরুবাড়ি দিয়ে দেয় বাংলাদেশ। কিন্তু ভারত এ শর্ত বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকে।

১৯৯০ সালে বাংলাদেশকে তিন বিঘা ব্যবহারের অনুমতি দেয় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯২ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও এর মধ্যে আরো একটি চুক্তি হয়।

এ চুক্তির ভিত্তিতে ১৯৯২ সালের ২৬ জুন তিন বিঘা করিডর ব্যবহারের শর্তযুক্ত অনুমতি দেয় ভারত। এতে ছিটমহলের বাসিন্দাদের সকাল ছ’টা থেকে সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা পরপর ওই করিডোর দিয়ে চলাচলের সীমিত সুযোগ তৈরি হয়।

অনেক দেনদরবারের পর ২০০১ সালের ১১ মার্চ থেকে শুধু দিনের বেলা কোন বিরতি ছাড়াই ১২ ঘণ্টা তিনবিঘা করিডর দিয়ে চলাচলের অনুমতি মেলে।

১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে ছিটমহল সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হয় আওয়ামী লীগও। তবে কাজ হয়নি তাতেও।

দিল্লিতে ২০০০ সালের ডিসেম্বরে দু’দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে যৌথ সীমানা ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এ পর্যন্ত গোটা চারেক বৈঠক করে ১৯৭৪ সালের চুক্তির আলোকে সীমান্ত সমস্যা সুরাহার সিদ্ধান্ত নেয় উভয় পক্ষ।

ছিটমহল ও অপদখলীয় জমিগুলোতে ২০০৭ সালে যৌথ সফরের পর ধাপে ধাপে বিষয়গুলো সুরাহার প্রস্তাব তোলে বাংলাদেশ।

কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়, ধাপে ধাপে নয়, সমন্বিতভাবে বিষয়গুলো সমাধান করতে চায় তারা।

সর্বশেষ ভারতের মনমোহন সিংহ দু’দিনের বাংলাদেশ সফরে এসে ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তিন বিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার ঘোষণা দেন।

কিন্তু এতেও সমাধান হয় না ছিটমহল সমস্যার। তিন বিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টা খোলার রাখার ঘোষণা দিলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর সব ছিটমহল নিয়ে কোন কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছতে ব্যর্থ হন।

তাই বাংলাদেশে মনমোহনের সফরের দ্বিতীয় ও শেষ দিন ৭ সেপ্টেম্বর থেকেই নতুন করে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ শুরু হয় ছিটমহলগুলোতে। বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের ছিটমহলের বাসিন্দারাই নানা কর্মসূচি পালন শুরু করেন। এমনকি টানা দু’রাত বাতি নিভিয়ে রেখে অভিনব প্রতিবাদ জানায় উভয় দেশের ‘ছিটের মানুষ’। সাড়ে ছ’ দশক অপেক্ষা করেও স্বাধীন দেশের মুক্ত নাগরিকের জীবন-যাপনের স্বপ্ন যেন লুকোচুরি খেলছে তাদের সঙ্গে।

পাঠকের মন্তব্য